সরাসরিঃ

Tuesday, July 28, 2026

অর্ধশতকেও মেলেনি বিচার: ৫০ বছর ধরে ঝুলে আছে বিচার; বাদী-সাক্ষীর মৃত্যু, পলাতক আসামি ও আইনি জটিলতায় বিচার অনিশ্চিত।

 আইন ও আদালত ডেস্ক | দৈনিক প্রতিকার

স্বাধীনতার পর দেশের অন্যতম আলোচিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) চার কর্মকর্তা হত্যা মামলা পাঁচ দশক পেরিয়েও বিচারিক নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। মামলার নথি এখনও আদালতে সচল থাকলেও সময়ের ব্যবধানে বাদী, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ও একাধিক আসামির মৃত্যু, পলাতক আসামি এবং দীর্ঘ আইনি জটিলতায় বিচারকাজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।



আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি বর্তমানে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সম্প্রতি বিচারক মো. আলমগীর মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১৯ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।

১৯৭৫ সালের সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ড

মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন চলছিল। দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন না হওয়ায় আন্দোলনকারীদের একাংশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।

৬ নভেম্বর ১৯৭৫ রাতে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়। পরদিন ৭ নভেম্বর সকালে বিটিভির ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম মনিরুল আলম, চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার আকমল হোসেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ এফ এম সিদ্দিক অফিসে এলে তাদের ভবনের নিচতলার ১০১ নম্বর কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে একই দিন ক্যামেরাম্যান চৌধুরী মো. ফিরোজ কাইয়ুমকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করা হলেও ওই রাতেই চার কর্মকর্তাকে একটি গাড়িতে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের হত্যা করে বিটিভি ভবনের পেছনের খালে, বর্তমান হাতিরঝিল এলাকায় লাশ ফেলে দেওয়া হয়।

কঙ্কাল উদ্ধারের পর হত্যা মামলা

স্বজনরা তাদের খুঁজে না পেয়ে ১৯ নভেম্বর ১৯৭৫ গুলশান থানায় অপহরণ মামলা করেন। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ খালের পানি শুকিয়ে গেলে চারটি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরনের পোশাক ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয় এবং মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

প্রথম তদন্তে রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করলে মামলার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

তবে নিহত আকমল হোসেনের স্ত্রী মনোয়ারা আকমল খান পুনঃতদন্তের আবেদন করলে ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি পুনরায় তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়। একই বছরের ২৫ মার্চ আদালত সিআইডিকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।

পুনঃতদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ১৮ আগস্ট সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল করিম খান নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

বিচারে দীর্ঘসূত্রতা

২০০২ সালে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। পরে এক আসামির মৃত্যু হওয়ায় ২০০৩ সালে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে এক আসামি হাইকোর্টে মামলা বাতিলের আবেদন করলে ২০০৫ সালে বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর হাইকোর্ট রুল খারিজ করলে পুনরায় বিচার শুরু হয়।

সাক্ষী নেই, বাদীও মৃত

মামলার সবচেয়ে বড় সংকট এখন সাক্ষী ও বাদীর অনুপস্থিতি। মামলার বাদী মনোয়ারা আকমল খান ২০০৪ সালের আগেই মারা গেছেন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষীকেও তাদের ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ আদালতকে জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, নয়জন আসামির মধ্যে চারজনের মৃত্যুর তথ্য আদালতের নথিতে রয়েছে। বর্তমানে চারজন আসামি জামিনে থেকে পলাতক এবং মাত্র একজন নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন।

বিচার হবে তো?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, সাক্ষীদের মৃত্যু, আসামিদের অনুপস্থিতি এবং প্রমাণ উপস্থাপনের জটিলতা সব মিলিয়ে মামলাটি বিচারিকভাবে অত্যন্ত কঠিন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে মামলাটি এখনও বিচারাধীন থাকায় আদালত সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

অর্ধশতক আগে সংঘটিত এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হবে কি না, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে ভুক্তভোগী পরিবার ও আইন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা বিলম্ব হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

No comments:

Post a Comment