সরাসরিঃ

Friday, September 11, 2026

“বিশ্ব যখন ২০৫০–২০৭০-এর পৃথিবীর নকশা আঁকছে, বাংলাদেশ কেন AI দিয়ে ৮০–৯০-এর দশক পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত।”

অতীতকে স্মরণ করা সংস্কৃতি; কিন্তু অতীতের মধ্যে আটকে থাকা চিন্তার সংকট। AI-এর প্রকৃত শক্তি যদি ভবিষ্যৎ কল্পনা ও উদ্ভাবনে হয়, তবে আমাদের চিন্তা কেন বারবার পেছনের দিকে?

অতীত অবশ্যই মধুর কিন্তু, চীন-জাপান যখন ২০৫০–২০৭০ এর পৃথিবী নিয়ে গবেষণা করছে, বাংলাদেশ কি শুধু ৮০–৯০-এর দশকের ছবি বানিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত ইতিহাসে এমন একটি পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যার প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, গবেষণা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর পড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় AI-এর ব্যবহার লক্ষ্য করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, আমরা কি এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করছি, নাকি মূলত অতীতকে পুনর্নির্মাণের বিনোদন হিসেবে ব্যবহার করছি?

“বিশ্ব যখন ২০৫০–২০৭০-এর পৃথিবীর নকশা আঁকছে, বাংলাদেশ কেন AI দিয়ে ৮০–৯০-এর দশক পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত।”

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে AI দিয়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণের প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। পুরোনো রিকশা, টেলিভিশন, রাস্তা, দোকানপাট, শহরের অবকাঠামো, পোশাক কিংবা সেই সময়ের জীবনযাত্রার দৃশ্য তৈরি করে মানুষ অতীতের স্মৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। এর মধ্যে অবশ্যই সৃজনশীলতা আছে এবং ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণের মূল্যও রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন AI-এর মতো একটি বিপ্লবী প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের চিন্তাকে অতীতের পুনর্নির্মাণে সীমাবদ্ধ করে ফেলে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও পরিকল্পনার জায়গাটি তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত থাকে।

চীনের সাম্প্রতিক প্রযুক্তি নীতির দিকে তাকালে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। ২০২৬ সালে চীনের National Development and Reform Commission জানিয়েছে, ২০২৬–২০৩০ সময়কালে দেশটি “AI Plus” উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের AI-সম্পর্কিত শিল্পের মূল্য ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে AI-কে শুধু একটি প্রযুক্তি হিসেবে নয়, শিল্প, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ভোগ ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চীনে AI-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪,৫০০ ছাড়িয়েছে বলেও চীনা সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে জাপান আরও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার উদাহরণ তৈরি করেছে। দেশটির Moonshot Research and Development Program-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে এমন AI-রোবট তৈরি করা, যারা নিজের পরিবেশ থেকে শিখতে পারবে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারবে। জাপানের সরকারি গবেষণা কর্মসূচিতে শুধু গৃহস্থালি বা শিল্পের রোবট নয়, দুর্যোগ মোকাবিলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা, অবকাঠামো নির্মাণ এমনকি চাঁদে মানব বসতি স্থাপনের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এখানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপান ভবিষ্যৎকে শুধু কল্পনা করছে না; তারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমস্যাকে আজকের গবেষণার বিষয় বানাচ্ছে। তাদের ২০৫০ সালের একটি লক্ষ্য হলো AI ও রোবটের সহ-বিবর্তনের মাধ্যমে এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা মানুষের শ্রমের ঘাটতি মোকাবিলা করবে, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় মানুষের পরিবর্তে কাজ করবে এবং বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আবিষ্কারে ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বের AI গবেষণার চিত্রও দেখায় যে প্রতিযোগিতাটি এখন কেবল ছবি বা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। Stanford-এর AI Index 2026 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি AI বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২৮৫.৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে চীনের বেসরকারি AI বিনিয়োগ ছিল ১২.৪ বিলিয়ন ডলার; তবে চীনের সরকারি নির্দেশিত তহবিলের কারণে শুধু private investment দিয়ে দেশটির মোট AI ব্যয়কে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। অর্থাৎ বড় রাষ্ট্রগুলো AI-কে জাতীয় অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কৌশলগত অংশ হিসেবে দেখছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা AI দিয়ে কী করছি? পুরোনো বাংলাদেশের ছবি তৈরি করা নিঃসন্দেহে করা যেতে পারে। কিন্তু একই প্রযুক্তি দিয়ে যদি বাংলাদেশের আগামী ৫০ বছরের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নগরব্যবস্থা, পরিবহন, জলবায়ু মোকাবিলা, শিল্প, জ্বালানি ও গবেষণা নিয়ে কাজ করা যায়, তাহলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি।

ধরা যাক, আজ একজন তরুণ AI ব্যবহার করে ১৯৯০ সালের ঢাকার একটি রাস্তার ছবি তৈরি করলেন। এটি একটি স্মৃতিচিত্র। কিন্তু সেই তরুণ যদি একই AI ব্যবহার করে গবেষণা করেন, ২০৫০ সালের ঢাকা কীভাবে জলাবদ্ধতা ও যানজট মোকাবিলা করতে পারে, কীভাবে গণপরিবহন আরও কার্যকর হতে পারে, কীভাবে নগর তাপমাত্রা কমানো যায়, কীভাবে বন্যার পূর্বাভাস আরও কার্যকর করা যায়—তাহলে সেই কাজটি শুধু ছবি তৈরি করবে না, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিন্তাও তৈরি করবে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই AI-বিষয়ক একটি নতুন সামাজিক ও গবেষণামূলক সংস্কৃতি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও তরুণদের মধ্যে “বাংলাদেশ ২০৫০” কিংবা “ঢাকা ২০৭০”-এর মতো ভবিষ্যতমুখী গবেষণার ধারণা তৈরি হতে পারে। আমাদের জানতে হবে আগামী অর্ধশতাব্দীতে কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পরিবর্তন করতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, কৃষিকে কীভাবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করা যায় এবং AI ব্যবহার করে কীভাবে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যার জন্য প্রযুক্তি তৈরি করা যায়।

অতীত আমাদের পরিচয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ আমাদের দায়িত্ব। ৮০ কিংবা ৯০-এর দশকের বাংলাদেশকে AI দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা যেতে পারে, স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে; কিন্তু একটি জাতি যদি কেবল তার অতীতের ছবি বানাতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে সে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। AI-এর প্রকৃত শক্তি হলো শুধু “কী ছিল” তা দেখানো নয়, বরং “কী হতে পারে” তা নিয়ে চিন্তা করা এবং সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ খুঁজে বের করা।

আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই হওয়া উচিত, আমরা ১৯৯০ সালের বাংলাদেশকে AI দিয়ে কতটা সুন্দরভাবে দেখাতে পারি, তা নয়; বরং ২০৫০ বা ২০৭০ সালের বাংলাদেশকে বাস্তবে কতটা উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে আজ আমরা কতটা চিন্তা ও গবেষণা করছি।

কারণ চীন, জাপানসহ বিশ্বের অগ্রসর রাষ্ট্রগুলো যখন আগামী কয়েক দশকের প্রযুক্তি, রোবট, AI, শক্তি ও মানবজীবনের সম্ভাব্য রূপ নিয়ে গবেষণা করছে, তখন বাংলাদেশেরও সময় এসেছে অতীতের স্মৃতিকে সম্মান করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নকশা তৈরি করার। অতীতকে সংরক্ষণ করা সংস্কৃতি; কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সভ্যতার অগ্রযাত্রা।

লেখকঃ আবদুর রব পারভেজ রবি, আইনজীবী ও আইন বিশ্লেষক এবং কলামিস্ট।

No comments:

Post a Comment